সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

মায়ের জন্য

আমার মা মারা গেলেন। ১৪ আগস্ট তিনি চলে গেলেন অনেক দূরে। আর তাঁকে কাছে পাব না। এই কদিন শুধু ভেবেছি, কী হারালাম। আজ তাঁকে নিয়ে লিখতে ইচ্ছে করছে। তাঁর জীবনটাই ছিল এমন, যা নিয়ে কথা বলা যায়। কলকাতার মেয়ে ‘সৈয়দা জাহানারা’ সেই ১৯৪৮ সালে দেশভাগের পর এ দেশে এসে মা-বাবার সঙ্গে খুলনায় বসবাস শুরু করেন। এরপর বিবাহ সূত্রে দিনাজপুরে। সেখানকার নামকরা পরিবার মৌলভী কাদের বক্সের মেজো ছেলে শামসুজ্জোহা কাদের বক্সের সঙ্গে বিয়ে এবং পরে চাকরি সূত্রে দিনাজপুর জেলার এক অজপাড়াগাঁ ঠাকুরগাঁওয়ে। কেমন করে যেন এই শান্ত নিবিড় এলাকাটি হয়ে ওঠে তাঁর আপন জায়গা। ভালোবেসে ফেলেন সেখানকার গাছপালা, পাখি, ফুল, আকাশ-বাতাস আর মানুষদের। বড্ড নম্র ও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন আমাদের আদরের এই ‘মা'। তার ব্যক্তিত্ব সবাইকে হার মানাত। তিনি সর্বপ্রথম ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে আরডিআরএসে। সময়টা ছিল ১৯৭৩ সাল। এ সময় তিনি নারী পুনর্বাসনের কাজে হাত দেন। তাঁর কর্মনিষ্ঠার পরিচয় পেয়ে ১৯৭৫ সালে কানাডিয়ান এক এনজিও সৈয়দা জাহানারাকে তাদের সঙ্গে কাজ করার আমন্ত্রণ জানায় এবং তিনি বাংলাদেশের ‘কান্ট্রি হেড’ হিসেবে যোগদান করেন। তখনকার দিনে ঠাকুরগাঁও ছিল এমন এক শহর, যেখানে বেশির ভাগ মেয়ে সংসারধর্ম ছাড়া আর তেমন কিছুই করত না। পড়াশোনাও ছিল না তেমন; বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোয়। স্বামী, ভাই, বাবা অত্যাচার করে ঘর থেকে বের করে দিলেও কিছুই করার উপায় ছিল না তাদের। এমনকি জাল দলিলে টিপসই নিলেও কিছুই বোঝার উপায় নেই। এসব বড্ড কষ্ট দিত মাকে। বিয়ের পর নিজ উদ্যোগে এমএ পাস করেন তিনি। বহু কষ্ট, ত্যাগ করে এটা ছিল তাঁর অর্জন। মা সব সময় চাইতেন, যেন মেয়েরা কিছু করে মাথা উঁচু করে চলতে পারে। আর এ জন্যই তিনি নিজ উদ্যোগে ঠাকুরগাঁওয়ের কজন মহিলা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘মহিলা সমবায় সমিতি'। যেখানে বেশ কিছু অশিক্ষিত নারীকে জড়ো করে তাদের বিনা অর্থে হাতের কাজ শেখাতে শুরু করেন, যাতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারে। এরপর মাত্র ৩৫টি এতিম মেয়ে-বাচ্চা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন একটি শিশুনিবাস। যদিও এখন সবাই সেটাকে এতিমখানা বলেই জানে, কিন্তু এতিমখানা কথাটিতে ছিল তাঁর ঘোর আপত্তি। এরপর একে একে ঠাকুরগাঁওয়ে মহিলা কলেজ, দুটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। আজ সেই প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বড় হয়েছে। সেই নারীরাও আর আগের মতো নেই। ঠাকুরগাঁওয়ের অনেক মানুষ, বিশেষ করে নারীসমাজ, আজ যারা বিভিন্ন কাজে, বিভিন্ন ভালো সংস্থায় এবং সমাজে সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত, তাদের প্রায় সবাই সৈয়দা জাহানারার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিলেন। সেই সত্তর-আশির দশকের যেসব মানুষ সেখানে এখনো আছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে তিনি এক নামে পরিচিত। তা হলো—‘খালাম্মা’। মায়ের কাছে জাত, ধর্ম, উঁচু-নিচু ভেদাভেদ দেখিনি কখনো। তাঁর কাছে ছিল সবাই সমান। কোন মানুষ খেতে পারছে না, কার পড়াশোনা হচ্ছে না, টাকার জন্য কে চিকিত্সা করাতে পারছে না—সব খবর ছিল তাঁর কাছে। কেউ কখনো খালি হাতে ফেরেনি। ঈদ, রোজা, বিয়ে, মৃত্যু—যেকোনো অনুষ্ঠানে আমাদের কোনো কাজ করার মানুষ খুঁজতে হয়নি। চলে এসেছে নিজেরাই। কত পুরোনো কাজের মানুষ আসত দেখা করতে। আমি শুধু অবাক হতাম মাকে দেখে। আমার কাছে সে এক অন্য জিনিস। যেন আমার মা না। তবে এটা আমার অনুভূতির কথা। আমাদের সব ভাইবোন ছাড়াও আজও কাঁদছে ঠাকুরগাঁওবাসী। কত প্রতিষ্ঠান যে মায়ের জন্য মিলাদ দিচ্ছে, কতজন যে দোয়া করছে, তার হিসাব নেই। বাচ্চাদের কষ্ট সহ্য হতো না মায়ের। আর এতিম বাচ্চা হলে তো কথাই নেই। নিজের ছেলেমেয়ে, তাঁর বড় ভাশুরের ছেলেমেয়ে ছাড়াও মা আরও একজন বাচ্চাকে নিজের কাছে রেখে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করেছেন। ১৪ আগস্ট বিকেল পাঁচটা ৩০ মিনিটে ঢাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে আমাদের মা সৈয়দা জাহানারাকে নিয়ে পৌঁছালাম আমরা তাঁর প্রিয় ঠাকুরগাঁওয়ে। আগেও বহুবার ঢাকা থেকে নিজ আবাসস্থলে ফিরেছেন তিনি। কিন্তু এবার ফিরল তাঁর নিথর দেহ। আগে যখন আমরা বাড়ি যেতাম মায়ের কাছে, দেখতাম, মা বড় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায়। কিন্তু সেদিন মা আসছেন আর সবাই ছিল তাঁর অপেক্ষায়। লিভার সিরোসিস হয়েছিল মায়ের। ৩৫ বছর ধরে ডায়াবেটিস, হার্টে রিং বসানো পাঁচটা। কিন্তু মনের জোর যেন হাজার গুণ বেশি। মানসিকতায় আজ থেকে ৫০ বছর এগিয়ে। গোসল করে, আতর দিয়ে, সাদা কাপড় পরে যখন মা শুয়ে ছিলেন, দেখতে এত সুন্দর লাগছিল! মাগো, মনে হচ্ছিল, তুমি যেন তোমার সেই কলেজের সময়ে চলে গেছ। আমার মায়ের সেই ছবিটা আজও আমার মনে গাঢ় হয়ে আছে! * এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২ সেপ্টেম্বর ২০১০ এর প্রথম আলোয়। শ্রদ্ধেয় সৈয়দা জাহানারার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে লেখাটি এখানে পুনপ্রকাশিত হলো।
এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

ma, mother, love, dearest, daughter, memory