সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে মাতোয়ারা যুক্তরাজ্য এবং পশ্চিমা সভ্যতার মিথ

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সিংহাসনে আরোহণের ৬০ বছর পূর্তি তথা হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে যুক্তরাজ্যে চলছে চার দিনব্যাপী উৎসব । বর্ণিল সাজ আর নানা অনুষ্ঠানে লন্ডন পরিণত হয়েছে এক উৎসবের নগরে। এই উৎসব নিয়ে এখন মাতোয়ারা পুরো যুক্তরাজ্য। লাখো জনতা জড়ো হয়েছে সারে কাউন্টিতে ঐতিহাসিক এপসম ডার্বি ময়দানে। উৎসব উপলক্ষে পুরো শহর জুড়ে টানানো ব্যানার, ফেস্টুনে গুণকীর্তন করা হয়েছে ব্রিটিশ রাজপরিবারের। রানির হীরকজয়ন্তী উৎসব নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমে ফলাও করে খবর প্রচার করা হয়। শনিবার দেশটির সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্র দ্য সান-এর শিরোনাম ছিল, ‘আপনি নিত্য ঘুম থেকে ওঠেন এমন সকাল এটা নয়। এই সকালটার ব্যাপারে ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে। সারা জীবনে একটিবার মাত্র পাওয়া এই উপলক্ষকে সর্বোত্তমভাবে উপভোগ করেন। এ রকম আরেকটি সময় আসতে বহু বছর লেগে যাবে।’ রাজা-রানী, রাজতান্ত্রিক শাসনের প্রতি ব্রিটিশ সমাজের এই ধরনের উন্মাদনা এবং জাদুকরি টান(ভালোবাসা) একবিংশ শতকের সভ্য সমাজে সত্যি বেমানান; এই ধরনের সাংস্কৃতিক দেওলিয়াপানা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে পশ্চিমা সভ্যতার অন্যতম তীর্থস্থান ব্রিটেনের রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যম এবং সাধারন মানুষের মাঝে এখনও অন্ধত্ব ও কুসংস্কার কতটা প্রবল, ঐতিহ্যের প্রতি অদ্ভুত ভাবাবেগের নামে যুক্তিহীন আদর্শিক কাঠামোকে লালন করার অভিলাষ তাদের অন্তরে শুধু নয়, জিনে মিশে আছে। সম্প্রতি পরিচালিত একটি জরিপ বলছে, রাজতন্ত্র অব্যাহত রাখার বিষয়টি ৮০ ভাগ ব্রিটিশ এখনো সমর্থন করে। এটা কখনোই ব্রিটিশ সমাজের আধুনিকতা এবং সভ্যতার নিদর্শন হতে পারে না যে অধিকাংশ জনতা রাজতন্ত্রকে অব্যাহত রাখার ব্যাপারে সম্মতিদান করবে, সে রাজতন্ত্র যতই ক্ষমতাহীন হোক না কেন, তার প্রতি ন্যূনতম সমর্থন দানও নৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে সমর্থন যোগ্য নয়। অথচ পুরো ব্রিটিশ সমাজ যেভাবে রানির হীরকজয়ন্তী নিয়ে উৎসবে মেতে উঠেছে তা আর যাই হোক একটা আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের সাথে খাপ খায় না। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা রাজতান্ত্রিক শাসনের জন্য যেখানে ব্রিটিশদের লজ্জাবোধ করা উচিত; যে রাজতান্ত্রিক শাসনের মাধ্যমে সভ্য (???) ব্রিটেন বিশ্বব্যাপী উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যেভাবে সারা দুনিয়ার মানুষকে শোষণ করেছে; লুটপাট আর লুণ্ঠনের মাধ্যমে যেভাবে এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দেওলিয়া করেছে তাতে আজ ব্রিটিশদের মাঝে যেখানে অপরাধবোধ কাজ করার কথা, যেখানে রাজতন্ত্রের প্রতি তীব্র ঘৃণার উদ্রেক হওয়ার কথা সেখানে তা নিয়ে গর্ববোধ এবং অহেতুক তুমুল উৎসবে মেতে উঠা ব্রিটিশদের অসভ্যতা এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই না। আজ রানীর হীরকজয়ন্তির প্রতিটি উল্লাসের সাথে সাথে মনে পড়ে যায় এশিয়ার প্রতিটি জনপদের পরাধীনতার ঔপনিবেশিক ইতিহাস; আজ সারে কাউন্টিতে এপসম ডার্বি ময়দানে লাখো জনতার সঙ্গে যখন রানি ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন তখন আমার অশ্রু ভেজা চোখে কেবলি ভেসে উঠে আফ্রিকার প্রতিটি দেশের উপর ঔপনিবেশিক শোষণের মর্মন্তুদ দৃশ্যপট; আজ ব্রিটেনের সেনাবাহিনী ও হাউজহোল্ড ডিভিশনের দুই হাজার সদস্য যখন ওয়েস্টমিনস্টার হল থেকে ঘোড়ার গাড়ির মিছিল বের করে বাকিংহাম প্যালেসে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন আমার কেবলই ভারতের বিপ্লবীদের উপর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের কথা মনে পড়ে যায়; আমার কেবলই মনে পড়ে যায় ভিক্টোরিয়া পার্কে স্বাধীনতাকামীদের ফাঁসিতে ঝুলানোর কথা। পশ্চিমা দার্শনিক এবং বুদ্ধিজীবীরা প্রাচ্যকে প্রায়ই নিকৃষ্ট, পশ্চাৎপদ, অন্ধকারাবৃত, যুক্তিহীন, বর্বর, অসভ্য (বেভার) এবং স্বৈরাচারের লীলাভূমি (মন্তেস্কু, আরিস্ততল, ভিটফোগেল) বলে তাদের লেখনীতে বিশেষ করে প্রাচ্যবাদের ডিসকোর্সে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন, কিন্তু পশ্চিমা সমাজের ভিতরকার রাজতান্ত্রিক শাসন, তাদের অন্ধত্ব ও কুসংস্কার, তাদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব সম্পর্কে এসব পণ্ডিতেরা রহস্যজনকভাবে নীরব থেকেছেন। যে রাজতান্ত্রিক শাসনে ব্রিটেন বিশ্বব্যাপী উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে তাবৎ দুনিয়াকে পদানত করে লুণ্ঠনের মাধ্যমে নিজেদের উন্নতি তরান্বিত করেছে তার প্রতি ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও যারপারনাই পরিতৃপ্ত; তাই তাদের এই ঐতিহাসিক শাসন কাঠামোকে উৎসবের মাধ্যমে উদযাপনের একটা তাগিদ তারা বোধ করতেই পারেন। তবে এই উত্তর আধুনিক যুগে এসে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে মাতোয়ারা হওয়া তাদের নীচ এবং অসভ্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকেই নগ্নভাবে তুলে ধরে। এটা হচ্ছে মূলত তাদের সমাজের আত্মিক দাসত্তের বহিঃপ্রকাশ। : যোবায়ের আল মাহমুদ, প্রভাষক, ফার্মেসী অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

british, emperor, history, celebration, sub-continent, africa, asia