সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

men-style.jpg

শীতের যত্ন এই শীতে ছেলেদের ত্বক, চুল ও শরীরের যত্ন

পৌষ আসতে এখনো পক্ষকাল বাকি। ঋতু বিভাজনে পৌষ ও মাঘ মাস শীতের জন্য বরাদ্দ হলেও প্রকৃতিতে শীত থাকে তিন-চার মাস। সুতরাং আগামী কয়েকটা মাস থাকবে শীতের দখলে। আর তাই জীবনযাত্রায় আসন্ন পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেবার বিশেষ কিছু প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই।

এ কুয়াশা আঁধার ঢাকায় না, থাকে না এক প্রহর
বৃষ্টিহীন, ধূলোয় মলিন, চারদিকে রুক্ষতার চাদর,
মেঘ বরষার কাটিয়ে সময়, শীত পানে এগোয়
একাকী শিউলী-বকুলহীন তোর এ যান্ত্রিক শহর .....

কবির ভাষ্যানুযায়ী রুক্ষ আর মলিন শীতের প্রথম মাস পৌষ আসতে এখনো পক্ষকাল বাকি। নগরীতে শীতের আগমন স্বল্প দৈর্ঘ্যের দুপুরটায় রোদের অল্প গরম, সন্ধ্যায় হিমেল হাওয়া, বাতাসে হালকা শীতের কাঁপুনি আর প্রতিটি ভোরের হালকা কুয়াশায় সীমাবদ্ধ থাকলেও শহরতলী আর গ্রাম-গঞ্জে এরই মধ্যে জেঁকে বসতে শুরু করেছে শীত।

ঋতু বিভাজনে পৌষ ও মাঘ মাস শীতের জন্য বরাদ্দ হলেও প্রকৃতিতে শীত থাকে তিন-চার মাস। সুতরাং আগামী কয়েকটা মাস থাকবে শীতের দখলে। আর তাই জীবনযাত্রায় আসন্ন পরিবর্তন সাথে মানিয়ে নেবার বিশেষ কিছু প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই। 

শীতকালে প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ত্বকেও দেখা দেয় রুক্ষতা। সারাদিন শুধু আবহাওয়া ও ধুলোবালুতে চলার ফলে ত্বক হয়ে যায় অনেক খসখসে ও মলিন। মেয়েদের তুলনায় এ রুক্ষতা ছেলেদের বেলায় একটু বেশিই বোঝা যায়। কেননা ছেলেদের ত্বক স্বাভাবিকভাবেই একটু রুক্ষ।

শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় শুষ্ক আবহাওয়ার থাকার কারণে চামড়া শুকিয়ে খসখসে হয়ে যায়। এতে ত্বকের তেলতেলে ভাব কমে দেখা দেয় রুক্ষতা। যার ফলে ত্বক ফেটে যাওয়া থেকে শুরু করে ত্বকে চুলকানি পর্যন্ত জটিল সমস্যা দেখা দেয়। আবার শুষ্ক ত্বক থেকে শুরু হয় চুলের খুশকির সমস্যা, গোড়ালী ফেঁটে যাওয়া সহ নানাবিধ সমস্যা। তবে আগাম কিছু সর্তকতা জানা থাকলে এসব সমস্যার সম্মূখীন হতে হয় না।

ত্বকের যত্ন:
সকালে ঘুম থেকে উঠে হালকা কুসুম গরম পানিতে মুখ ধুয়ে নিতে পারেন, কেননা অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। গোসলের আগে হাত-পা এ আলিভ অয়েল, নারিকেল তেল কিংবা নারিকেল তেলের সঙ্গে মধু মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন। গোসলে মায়েশ্চারাইজিং সাবান ব্যবহার করতে হবে। ইচ্ছে করলে মুখ পরিষ্কার করার জন্য ময়েশ্চারাইজার যুক্ত ক্লিনজার দিয়ে মুখ ধুয়ে নিতে পারেন।

তবে র‌্যাশ অথবা অ্যালার্জীর সমস্যা না থাকলে শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষায় গরম পানিতে গোসল না করাই শ্রেয়। কেননা গরম পানি ত্বককে শুষ্ক করে দেয়। গোসল শেষে শরীরের ভিজে ভাব বজায় থাকা অবস্থাতেই যদি ময়েশ্চারাইজিং লোশন ব্যবহার করেন তাহলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে। গোসলের সময় শরীর থেকে যে আর্দ্রতা বেরিয়ে যায়, লোশন তা ফিরিয়ে আনে।

ত্বকের স্বাভাবিকতা ধরে রাখতে ময়েশ্চারাইজারের কোনো বিকল্প নেই। ময়েশ্চারাইজার ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রেখে ত্বককে রাখে সুস্থ আর সতেজ। শীতকালে দিনে অন্তত এক বার হলেও সারা শরীরে ময়েশ্চারাইজিং লোশন ব্যবহার করুন। প্রয়োজন মনে করলে আপনি দিনে কয়েকবারই লোশন ব্যবহার করতে পারেন।

শীতে ত্বকের আরেকটা সমস্যা হচ্ছে র‌্যাশ। অনেক সময় শরীরে লাল, ছোট ছোট ফুসকুনির মত হয়ে থাকে। এগুলো সাধারণত শীতকালে ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমন ও উলের পোশাক পরার কারনে হয়ে থাকে। এগুলো শরীরে চুলকানি ও অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরী করে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিন গোসলের পানিটাকে একটু ফুটিয়ে কুসুম গরম পানি দিয়েই গোসল করুন।

এছাড়া পানির ব্যাক্টেরিয়া দূর করার জন্য এন্টিসেপ্টিক জাতীয় কোনো লিকুইড মিশিয়ে নিতে পারেন। সবসময় উষ্ণ থাকার চেষ্টা করুন। উলের কাপড় পরার সময় অবশ্যই তার নিচে সুতি অথবা অন্য পাতলা এবং আরামদায়ক কাপড়ের কিছু পরে নিবেন।

ঘুমানোর আগে কুসুম গরম পানি দিয়ে হাত, পা ও ময়েশ্চারাইজার ফেইসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। এছাড়া রাতে ঘুমানোর আগে ১/৪ কাপ দুধ এ ১ চামচ মধু ও ১ চামচ এলোভেরা জেল মিশিয়ে মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট রেখে দিন। ২০ মিনিট পর কুসুম গরম পানিতে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এতে করে আপনার ত্বকের শুষ্কতা তো কমবেই তার সাথে আপনার মুখ হয়ে উঠবে আরো কোমল ও উজ্জ্বল।

চুলের যত্ন:
শীতের আগমনের সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় চুলের নানান সমস্যা যেমন শীতের শুরুতে মাথায় খুশকি, চুল ভাঙ্গা, রুক্ষ ও চিটচিটে হয়ে যাওয়া। সাধারণত হঠাৎ করে ঋতু পরিবর্তনের সময় ত্বকের সহনশীলতা বদলে যায় ফলে এই সব সমস্যাগুলো হয়ে থাকে।

সুন্দর চুল ছেলেদের ফ্যাশন ও সৌন্দর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই অবশ্যই খুশকিমুক্ত চুলের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। খুশকির জন্য কার্যকরী টোটকা হল লেবু ও পেঁয়াজের রস এক করে চুলে ম্যাসাজ করা। চুলে খুশকি দূর করার জন্য মাথায় গরম তেল ম্যাসাজ করাটাও বেশ উপকারি। প্রতিদিন চুলে শ্যাম্পু ব্যবহার না করে সপ্তাহে দুবার চুলে শ্যাম্পু ব্যবহার করা ভালো। তবে খুশকির সমস্যা বেশি হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শীতকালে অনেকেরই চুল রুক্ষ হয়ে যায় এবং চুলে এক ধরনের চিটচিটে ভাব চলে আসে। এর ফলে অনেক সময় চুলের আগা ফেটে যায়। তাই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে শীতের রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে চুলে নারিকেল তেল বা অলিভ অয়েল গরম করে ম্যাসাজ করে নিতে পারেন।
  • একটি স্টীলের বাটিতে নারিকেল তেল অথবা অলিভ অয়েল নিয়ে নিন। এবার একটা কাচা আমলকী কেটে এর সাথে মিশিয়ে নিন। এবার এটাকে চুলার উপর একটা কাপড় দিয়ে ধরে কিছুক্ষন গরম করে নিন। কিছুক্ষন রেখে গিয়ে কুসুম গরম থাকতে চুলের আগায় ও গোড়ায় ভালো করে আঙ্গুল দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তেল ম্যাসাজ নিন।
মনে রাখবেন, কখনোই খুব গরম তেল চুলে লাগাবেন না। এতে চুল পড়ে যেতে পারে। সারা রাত চুলে তেলের উপস্থিতিতে চুলের রুক্ষ ভাব কেটে যাবে এবং চুল হয়ে উঠবে ঝলমলে উজ্জ্বল। স্বাভাবিক চুল পড়া কমাতে সপ্তাহে একদিন চুলে কাঁচা-মেহেদিপাতা বেটে দিয়ে রাখুন। তারপর শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার ব্যবহার করুন।

ঠোঁটের যত্ন:
ত্বকের পাশাপাশি ঠোঁটের যত্ন নেয়া জরুরী। ছেলেরা শুধু মুখে বা শরীরে কোল্ড ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করলেও ঠোঁটে সাধারণত কিছুই ব্যবহার করেন না। এটি একদম করা যাবে না। কেননা মুখের ত্বকের চেয়ে ঠোঁট অনেক বেশি সংবেদনশীল। শীতে ঠোঁটের চামড়া উঠে যায়, ঠোঁট ফেটে যায়, কারও কারও ঠোঁট ফেটে রক্ত আসে। ঠোঁটে সব সময় গ্লিসারিন, ভ্যাসলিন, লিপবাম বা চ্যাপস্টিক ব্যবহার করলে ঠোঁটের এসব সমস্যা থাকবে না। যাদের ঠোঁটের সমস্যা একটু বেশি তারা সানস্ক্রিন লাগাতে পারেন।

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর আর শীতে ধূমপান করলে ঠোঁটের বেশি ক্ষতি হয়। তাই এই অভ্যাস ত্যাগ করা বাঞ্চনীয়।

পায়ের যত্ন:
শীত বাড়লে প্রকটতর হয় পায়ের নানান সমস্যা। পা ফাটা এবং পায়ের দুর্গন্ধ অন্যতম। তাই এ সময়ে পায়ের যত্ন নেওয়া জরুরি। পায়ের দুর্গন্ধ দূর করতে পাতলা ছিদ্রযুক্ত মোজা ব্যবহার করতে হবে। ব্যবহারের পর প্রতিদিন অথবা সুযোগমত জুতা রোদে শুকিয়ে নিন। আর মোজা একদিন পরার পর ধুয়ে রোদে শুকান। দুর্গন্ধ এড়াতে পায়ে দুর্গন্ধনাশক লোশন ব্যবহার করুন। সমস্যা প্রকট হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

নখের গোড়ায় জমে থাকা ময়লা থেকে জীবাণু সংক্রমিত হয়ে পায়ে দুর্গন্ধ ছড়ায়, তাই প্রতি মাসে অন্তত দুবার পেডিকিউর করলে পা থেকে দুর্গন্ধ দূর হয়ে যাবে।

শীতের দিনে আরেকটা সাধারন সমস্যা হচ্ছে পায়ের গোড়ালী ফেটে যাওয়া। এ থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিন ঘুমানোর আগে অবশ্যই পায়ে পেট্রোলিয়াম জেলী লাগিয়ে নিতে পারেন। এছাড়া প্রতিদিন গোসলের সময় শক্ত কিছু দিয়ে পায়ের গোড়ালীটা একটু ঘষে নিতে পারেন। এতে মৃত কোষগুলো বের হয়ে যাবে। এছাড়া নিয়মিত মশ্চারাইজার যুক্ত লোশন ব্যাবহার করুন। এতে করে হাত পায়ের খসখসে ভাব থাকে না।

এছাড়াও অনেককে দেখা যায় শীত আসার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যায়াম করা বন্ধ করে দেন। এটি করবেন না। কেননা শীতে পর্যাপ্ত ব্যায়াম করলে শরীরের পাশাপাশি ত্বক এবং মাথার ত্বকও সুস্থ থাকে।

শীতে শরীর খুব দ্রুত শুষ্ক হয়ে যায়। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। সেই সঙ্গে জুস, শরবত এসবও পান করতে পারেন। অনেকে শীতের ভয়ে পানি পানই বন্ধ করে দেন। পানি শরীরে আর্দ্রতা ধরে রেখে শরীরকে রাখে সুস্থ ও সতেজ। সেই সঙ্গে সুস্থ থাকে ত্বকও।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

শীতকাল, ছেলে, পুরুষ, যত্ন, চুল, ত্বক, ঠোঁট, পা, সচেতনতা, কুয়াশা, ঠান্ডা, রুক্ষ, আবহাওয়া